অবৈধ পথে ইউরোপের দিন শেষ: হয় মৃত্যু না হয় গ্রেফতার

0
662
অবৈধ পথে ইউরোপের দিন শেষ: হয় মৃত্যু না হয় গ্রেফতার

সুনামগঞ্জে ছাতকের জামসেদ মিয়া তালুকদারের ছে’লে আলাল মিয়া প্রায় একযুগ ধরে বিদেশে থাকেন। ৪৬ বছর বয়সী আলাল মিয়া জীবনের ১২ বছর কাটিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে। ভালোই চলছিল সব কিছু। হাতেও বেশ কিছু টাকা জমেছিল তার। সেটা দেখেই আলাল মিয়াকে ইউরোপ যাওয়ার প্রলো’ভন দেখায় দালাল। কাগজপত্র ছাড়াই ইউরোপে পৌঁছানোর লো’ভ দেখায় দালাল।

তুরস্ক থেকে গ্রিস নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়। একপর্যায়ে ওমান ছেড়ে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করে আলাল। দালালের হাতে তুলে দেয় মোটা অঙ্কের টাকা। কিন্তু তুরস্ক থেকে স্পিডবোটে দুর্গম মহাসাগর পার হয়ে গ্রিসে পৌঁছানো যে এখন অসম্ভব তা জানতে দেওয়া হয়নি আলালকে। টাকার লো’ভে আলালকে নিশ্চিত মৃ’ত্যুর মুখে ঠেলে দেয় দালাল। অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই গত ২৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে স্পিডবোট ডুবে সাগরেই মৃ’ত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আলাল মিয়া।

গ্রিস যাওয়ার কথা বলে রওনা হওয়া স্পিডবোটটি তুরস্কের পূর্বদিকে লেক ভ্যান হ্রদে ডুবে যায়। এই লেক দিয়েই ম’রণযাত্রার রুট ঠিক করে দালালরা। ছোট স্পিডবোটে আলালের সঙ্গে ছিল আরও ৭১ জন। এর মধ্যে ১৫ জন বাংলাদেশি, বাকিরা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের। ইরান সীমান্তের কাছাকাছি লেক ভ্যানে দুর্ঘ’টনাস্থলে কাছাকাছি থাকা জে’লেদের মাধ্যমে খবর পায় তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা। সৌভাগ্যক্রমে স্পিডবোট ডুবে যাওয়ার তাৎক্ষণিক তৎপরতায় জীবিত উ’দ্ধার করা সম্ভব হয় ৬৪ জনকে। ঘটনাস্থলেই মৃ’ত্যু হয় পাঁচজনের। আরও দুজন হাসপাতালে মা’রা যায়।

আলালের মতোই ঘটনাস্থলেই মা’রা যায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজে’লার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের পাইগাঁও গ্রামের মুজিবুর রহমানের ছে’লে মিজানুর রহমান। ৩২ বছর বয়সী মিজানুর রহমানের এক ভাই ইতালি, আরেক ভাই গ্রিসে থাকেন। গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে ২১ ডিসেম্বর রওনা দেয় মিজানুর। তুরস্ক গিয়ে ২৫ ডিসেম্বর উঠে সেই স্পিডবোটে। আলাল ও মিজানের মতো করুণ মৃ’ত্যু হয় সিলেট জে’লার বালাগঞ্জের পূর্ব মু’সলিমাবাদ গ্রামের সৈয়দ আহমেদের ছে’লে সৈয়দ ফয়সাল আহমেদ এবং নেত্রকোনার খালিয়াজুরির শালগাঁও গ্রামের চৌধুরী ওসমান ইউসুফের ছে’লে চৌধুরী ইউসহা ওসমানির। তুরস্কের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আল্লামা সিদ্দিকী’ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, তুরস্ক হয়ে ইউরোপ যাওয়া এখন আর সম্ভব নয়। তুরস্ক-ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ফলে এ পথে অ’বৈধ অ’ভিবাসন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য যে কোনোভাবেই দালাল চক্রের কথায় প্রভাবিত হয়ে ইরান, ইরাক, সিরিয়া ইত্যাদি দেশ হয়ে তুরস্কে অনুপ্রবেশ করা মানেই জীবনের ঝুঁ’কি নেওয়া ও মৃ’ত্যুর মুখোমুখি হওয়া। লেক ভ্যানের ম’র্মান্তির ঘটনাই এর প্রমাণ।

দূতাবাস জানায়, স্পিডবোট দুর্ঘ’টনার পর যাদের উ’দ্ধার করা হয়েছে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আ’ট’ক করে রেখেছে তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইনানুসারে শা’স্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে তুরস্ক। শা’স্তি শেষে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

আ’ট’ক থাকা বাংলাদেশিরা হলেন- যশোরের ঝিকরগাছার রাইপতন গ্রামের রেজাউল করিমের ছে’লে ইসমাইল হোসেন, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের আবদুল হকের ছে’লে আমির হামজা, শরীয়তপুরের রাজৈরের চর মোস্তফাপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন বয়াতির ছে’লে হাসান বয়াতি, সুনামগঞ্জ জগন্নাথপুরের শালদীঘা গ্রামের দেলোয়ার হোসাইনের ছে’লে অলি আহাদ, সিলেটের বিশ্বনাথের হিসবপুর গ্রামের বাদশা মিয়ার ছে’লে আক্কাস মিয়া, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের কাদিরপুর গ্রামের নিয়ামত আলির ছে’লে শাওন আহমেদ, কুমিল্লার মুরাদনগরের রাজাছাপিতলা গ্রামের চন্দন দেবনাথের ছে’লে সৈকত দেবনাথ, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের সিদ্ধাশপুর গ্রামের আবদুল মোমিন খানের ছে’লে মনজিল খান, কুমিল্লার দাউদকান্দির দনেশ্বর গ্রামের হাজী আয়াত আলীর ছে’লে মো. আলম, শরীয়তপুরের পালংয়ের মধ্য সোনামুখী গ্রামের মো. খলিলুর রহমান মোল্লার ছে’লে কামাল মোল্লা, মাদারীপুর সদরের উত্তর দুদখালী গ্রামের মো. হাবিবুর রহমান খানের ছে’লে আশিক খান।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শুধু নৌপথে নয় তুরস্ক হয়ে সড়ক পথেও গ্রিসে প্রবেশের কোনো উপায় এখন আর নেই। সীমান্তে কঠোর নজরদারিতে চোখ এড়ানোর কোনো উপায় নেই দালালচক্রের। গত ১০ জানুয়ারি প্রতিবেশী তুরস্ক থেকে সীমান্ত অ’তিক্রম করে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করে ১০ বাংলাদেশিসহ অ’ভিবাসীদের একটি দল। পু’লিশের তাড়া খেয়ে মা’রাত্মক গাড়ি দুর্ঘ’টনায় আ’হত হয় তারা প্রত্যেকেই। সেদিন মধ্যরাতে গ্রিসে কাভালা জে’লার কাছে প্রধান সড়কে একটি চেকপয়েন্টে তাদেরকে থামতে বলা হয়। কিন্তু তারা গাড়ি না থামিয়ে চলতে থাকে। ফলে পু’লিশ তাদের পিছু নেয়। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে থেসালোনিকি শহরে এর শেষ হয়। এ সময়ে তাদেরকে বহনকারী গাড়ি লাল বাতির সিগন্যাল অমান্য করে আ’ঘাত করে আরেকটি যাত্রীবাহী গাড়িতে। এতে অ’ভিবাসীরা আ’হত হয়। তার মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি। দুজন সিরিয়ার নাগরিক। আর অন্য গাড়ির একজন চালক। সিরিয়ার নাগরিকদের ও গাড়ি চালককে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছাড়পত্র দিলে গ্রিসে পু’লিশ তাদের গ্রে’ফতার করে কারাগারে নেয়। ১০ বাংলাদেশি মা’রাত্মক আ’হত হওয়ায় এখনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসা শেষ হলেই এই বাংলাদেশিদের গ্রে’ফতার করে কারাগারে পাঠাবে গ্রিসের পু’লিশ।
সূত্র: অনলাইন

www.francebanglanews.com

Advertisement By Francebanglanews

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here